ভয়েস-এর ঊদ্যোগে ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটি সম্মেলন কক্ষে গতকাল (৩ মে) আয়োজিত হয় ‘গণতন্ত্রের জন্য গণমাধ্যম’ শীর্ষক আলোচনা সভা। ভয়েস-এর নির্বাহী পরিচালক আহমেদ স্বপন মাহমুদ-এর সভাপতিত্বে প্যানেল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খ্যাতিমান সাংবাদিক মঞ্জ্রুল আহসান বুলবুল, অধ্যাপিকা গীতি আরা নাসরিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বিশিষ্ট সাংবাদিক সেলিম সামাদ, ব্যারিস্টার জোতির্ময় গুহ, পেন ইন্টারন্যাশনাল-এর ড.আইরিন জামান। অংশগ্রহণকারী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ।
সারা দুনিয়ায় ৩ মে পালন করা হয় ‘বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস’। ১৯৯১ সালে ‘স্বাধীন এবং বহুত্বমূখী আফ্রিকান সংবাদ’ শীর্ষক এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয় নামিবিয়ার রাজধানী উইন্ডোক-এ। তখন সুনির্দিষ্ট কিছু দিক নির্দেশনা ও সুপারিশ গ্রহণ করা হয়, যা ‘উইন্ডোক ঘোষণা’ নামে পরিচিত। এই ঘোষণার মূল বিষয় ছিলো: একটি স্বাধীন, বহুত্বমূখী ও মুক্ত গণাধ্যম প্রতিষ্ঠা করা, পরিচালনা করা এবং লালন করা, যা একটি জাতির গণতন্ত্রের উন্নয়নে ও চর্চায় ভূমিকা রাখতে পারবে। ‘উইন্ডোক ঘোষণা’-এর উপর ভিত্তি করে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৯৩ সালে ‘বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস’র গোড়াপত্তন করে।
আলোচনার শুরুতেই ভয়েস এর নির্বাহী পরিচালক আহমেদ স্বপন মাহমুদ আজকের আলোচনা সভার লিখিত প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি এই প্রবন্ধের উল্লেখ করেন যে, গণমাধ্যম রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃত এবং জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার সমান্তরাল বিকাশ, আইনের শাসন, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সর্বোপরি জনগণ ও রাষ্ট্রের মধ্যে সেতুবন্ধন স্থাপনে গণমাধ্যমের ভূমিকা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। অন্যদিকে ২০১৬-২০৩০ মেয়াদী জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভিষ্ঠ (এসডিজি), বিশেষ করে সুশাসন সম্পর্কিত অভিষ্ঠ ১৬ এর আঙ্গিকে গণমাধ্যমের সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা অধিকতর গুরুত্ব লাভ করেছে।
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উদযাপনে সার্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণায় ধারা ১৯ ও ধারা ২১-এ মুক্ত চিন্তা ও কথা বলার স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব সহকারে চর্চা করার কথা বলা হয়েছে এবং একইসাথে সার্বজনীন ভোটাধিকারের বিষয়টিকেও সমভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। নির্বাচনকালীন সময়ে নির্বাচন ও মত প্রকাশ এই দুটি বিষয়কে সংযুক্ত করে দেখানো হয়েছে। আজ সারা দুনিয়ায়, এমনকি কথিত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও মুক্তপ্রকাশ, বহুমাত্রিক, স্বাধীন ও নিরাপদ সাংবাদিকতা অনেক ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ ও হুমকির সম্মুখীন এবং বিশেষ চাপের মধ্যে বিরাজমান।
আলোচনা সভায় বিশিষ্ট সাংবাদিক সেলিম সামাদ বলেন, সেলফ সেন্সরশীপ আরও বেড়ে বিগত দিনের থেকে। টিভিটে স্ক্রল করা হলেও নিউজ করা হয় না। সাংবাদিকদেরকে নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে এবং তারা অনেক ঝুঁকির মধ্যে তাদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। ব্যারিষ্টার জোতির্ময় গুহ বলেন, সংবাদপত্র এখন কর্পোরেটদের স্বার্থ রক্ষা করছে। ৫৭ ধারা অপব্যবহার আরও বাড়ছে। শহীদুল হকের বিরুদ্ধে মামলা ও হয়রানি তার বড় উদাহরণ আমাদের সংবিধানে ৩৯ (২) ধারার পরিবর্তনের জন্য কথা বলা দরকার।
পেন ইন্টারন্যাশনাল এর ড. আইরিন জামান বলেন, ডিজিটাল সিকিউরিটি এ্যাক্ট নিয়ে এখনও ব্যাপক সংশয় আছে। সারা বিশ্বে নারী সাংবাদিকেরা এখন ব্যাপক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, সম্মিলিতভাবে কাজ করতে পারলে এক্ষেত্রে ভালো ফল আসবে। মানবাধিকার সাংবাদিক ফোরাম এর খায়রুজ্জামান কামাল বলেন, অনলাইন নিউজ মিডিয়া বেড়ে যাওয়া কিছু সমস্যা তৈরী হচ্ছে বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে। তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের হুমকি ধামকি নিয়ে সাংবাদিকদের কাজ করতে হচ্ছে। আগে সাংবাদিকতায় একটি দর্শন ছিলো এখন সেটি দেখতে পাওয়া যায় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. গীতি আরা নাসরিন বলেন, ভুয়া সংবাদ যাতে না আসে সেজন্যই তো সাংবাদিকদের নিউজটা দিতে হবে আগেভাগেই। তাহলে তো বিভ্রান্তি তৈরি হবে না। এখন সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমই অনেকটা বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছে। সাংবাদিকদের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি বহুমাত্রিকতা বাড়াতে হবে। নেটওয়ার্ক ভাড়াতে হবে।
খ্যাতিমান সাংবাদিক মঞ্জ্রুল আহসান বুলবুল বলেন, অনেক মিডিয়ার সংখ্যা বেড়েছে কিন্তুু মানসিকতার পরিবর্তন হয় নাই। ভূয়া সংবাদ বা মিথ্যা সংবাদের দায়-দায়িত্ব সম্পাদকগনকেই নিতে হবে। কোনো একটি খুনের ঘটনায় একেক পত্রিকা একেক শিরোনাম ও ভিন্ন নিউজ পরিবেশন করে। তাহলে পাঠকরা বা সাধারণ মানুষ কিভাবে ঘটনার সত্যতা খুঁজে পানে। ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে বাংলাদেশ-এর ৪ দাপ এর অবনয়ন নিঃসন্দেহে দুর্ভাগ্যজনক। তিনি আরও বলেন, একজন সাংবাদিক হতে হলে তাকে আগে একজন বুদ্ধিজীবী হতে হয়ে। নইলে কোনো সাংবাদিকই না। তিনি এও বলেন, কাঙাল হরিনাথের উদারহরণ দিয়ে, দেশ যখন কপটে ভরে যায়, চপট দিয়েও কিছু হয় না।
এছাড়াও এ আলোচনা অনুষ্ঠানে ইউএসএইড-এর এডভাইজার সুমনা বিনতে মাসুদ, ব্র্যাকের শিক্ষণ বিভাগের প্রধান অ্যামি পেনিংটন, নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসন, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বিজয়া আনাম, ড. একেএম সাইফুল্লাহ, আর্টিকেল ১৯ বাংলাদেশ থেকে আফ্রি আয়েশা এবং ঢাকা আহছানিয়া মিশন-এর প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।