শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষা জাতির সমৃদ্ধির চাবিকাঠি। জাতীয় উন্নয়নের মাপকাঠিই শিক্ষা। যে জাতি যত বেশী শিক্ষিত সে জাতি তত উন্নত। প্রাথমিক শিক্ষা হলো শিক্ষার ফাউন্ডেশন বা ভিত্তি। এ ভিত যত মজবুত আদর্শিক হবে, শিক্ষার মান ততই শক্তিশালী ও উন্নত হবে। শিক্ষা যদি হয় জাতির মেরুদণ্ড তা হলে শিক্ষক নিশ্চয়ই ওই মেরুদণ্ডের কারিগর। শিক্ষকতা মহান পেশা। শিক্ষকতা পেশায় অর্থকরি না থাকলেও আছে সম্মান। যুগে যুগে সকল সমাজে শিক্ষকরা সমাদৃত হয়ে আসছেন। শিক্ষকগণ তাদের মেধা মনন ও শ্রম দিয়ে একেকটি জাতি বিনিমার্ণে অবদান রেখে চলছেন সেই আদিকাল থেকে।
বলা হয় শিক্ষকরা জাতির বিবেক, মানুষ গড়ার কারিগর। কোন কিছু গড়তে হলে, সৃষ্টি করতে হলে প্রয়োজন দক্ষ, বিবেকবান কারিগরের। এদেরই অবদানে বিদ্যমান পৃথিবীর সকল অমর সৃষ্টি। সভ্যতা, জাতি, স্থাপত্য, জনপদ ইত্যাদি এদেরই অবদানের স্বীকৃতি বহন করে। শিক্ষা মানুষকে ‘কণ্ঠস্বর’ দেয়। যে শিক্ষা মানুষকে “কণ্ঠস্বর” দিতে পারে না, সেটা শিক্ষা নয়। শিক্ষিত মানুষ সমাজের অসঙ্গতির বিরুদ্ধে কথা বলে। সমাজের নিপীড়িত মানুষকে উপরে তুলতে পারে শিক্ষা। সমাজে আপনার অবস্থান বদলাতে পারে শিক্ষা।
প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা এই তিন স্তরের মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের শেখানো কাজ খুবই জটিল। একজন শিক্ষক ক্লাসে কখনো অভিনেতা, কখনো নেতা, কখনো শিক্ষক, কখনো শিল্পী, কখনো মাতাপিতার ভূমিকা পালন করতে হয়। একটি বিদ্যালয়ে বিভিন্ন পরিবেশ থেকে, অনেকগুলো কচিকাঁচা ছেলেমেয়ে একই সাথে একই কক্ষে নিয়ন্ত্রণ রেখে, প্রত্যেক শিশুকে শিক্ষাদান প্রক্রিয়া কঠিন। এই কঠিন কাজটিকে সহজ করতেই শিক্ষকদের প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা-প্রশিক্ষণ।
শিশুর মানসিক অবস্থা জানার জন্যে বিভিন্ন প্রদ্ধতি অবলম্বন করতে হয়। শিশুর ব্যক্তিগত প্রক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে হয়। বিশেষ করে শিশুর পছন্দ অপছন্দ, ইচ্ছা অনিচ্ছা, আগ্রহ, প্রবনতা, কৃতিত্ব, ব্যক্তিত্ব, প্রেষণা, ভাষা, মনোযোগ, জীবনধারা, অভিজ্ঞতা, বিশ্বাস অবিশ্বাস ইত্যাদি ক্ষেত্রে সূক্ষাতিসূক্ষভাবে বিশ্লেষণ করতে হয়। এখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন সহকারি শিক্ষক প্রতিটি শ্রেণিতে উল্লেখিত বিষয়সমূহ নিয়ে পরিকল্পনা করতে হয়, রীতিমত গবেষণা করতে হয়। শিক্ষকের পাঠপরিকল্পনা কাগজে কলমে দেখা গেলেও ঐ সকল পরিকল্পনা অদেখায় থেকে যায়। কিন্তু একজন আদর্শ শিক্ষক অবশ্যই এই সকল বিষয়সমূহ সূক্ষাতিসূক্ষভাবে বিশ্লেষণ করে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করতে হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গোটা উন্নত বিশ্বে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় এসেছে গুণগত ও মানগত পরিবর্তন। আর এই পরিবর্তনের মূখ্য ভূমিকা রয়েছে শিক্ষকদেরই। শিক্ষাদান পদ্ধতি ও শিক্ষার শিক্ষাক্রমে এই পরিবর্তন পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নেবার জন্য ৪ (চার) বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন অ্যাডুকেশন কোর্স চালু করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ইনস্টিটিউট অব প্রাইমারি চিটার্স। এগুলোতে আধুনিক শিক্ষা প্রযুক্তিই ব্যবহৃত হচ্ছে ব্যাপক আকারে।
শিক্ষক তারাই হবেন, যারা যোগ্য। তারা হবেন উপযুক্ত যোগ্যতা ও মনোভাবের অধিকারী এবং শিক্ষা ডিসিপ্লিনে হবেন শিক্ষিত ও প্রয়োজনীয় দক্ষতার অধিকারী। এর বহির্ভূত শিক্ষক যারা অঙ্গীকারাবদ্ধ নন, তারা অকার্যকর নিস্ক্রিয়। তারা শিক্ষকতা পেশায় কেবল বিশৃঙ্খলতাই সৃষ্টি করেন সৃজনশীলতায় নয়। বিশ্বব্যাপী এ সমস্ত পরিবর্তন ও বিবর্তনের ঢেউ অনিবার্যভাবে কারণবশত আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাতে লাগেনি।
অথচ শিক্ষা উন্নয়নের জন্য যা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমী (ঘঅচঊ) কর্তৃক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য পরিচালিত ৫৬টি প্রাইমারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে (পিটিআই) ১৮ মাস মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন অ্যাডুকেশন দেশের শিক্ষা আকাক্সক্ষা পূরণ করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গমনোপযোগী শিশুদের মধ্যে প্রায় শতভাগ শিশু এখন বিদ্যালয়ে আসছে। বিদ্যালয়ে শতভাগ ভর্তি লক্ষ্যটি প্রায় অর্জিত হলেও শিশুদের যোগ্যতাভিত্তিক পাঠদানের কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হয়নি। এ ক্ষেত্রে পাঠদানের গুণগত মান নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন শিশুবান্ধব বিদ্যালয়, উপযুক্ত পাঠ্যক্রম, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, উপযুক্ত পাঠদান পদ্ধতি ও শিশুদের সঠিক মূল্যায়ন। শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেতে ইচ্ছুক ইংরেজি ভাষা সর্ম্পকে জ্ঞানের বিষয়টিকে প্রাধান্য দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের পাঠদানের নতুন শিক্ষানীতিতে ২০১৮ সাল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বাস্তবায়িত করার সরকারি ঘোষণা থাকলেও আপাতত হচ্ছে না প্রশিক্ষিত শিক্ষকসহ শিক্ষক সঙ্কটের কারণে। ফলে প্রাথমিক শিক্ষা পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণিতে উন্নীত করা নিয়ে চরম বেকায়দায় পড়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা এবং সংস্কৃতির মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়ে আছে। শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে এক সূতায় গাঁথা যায়নি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে জীবিকার জন্য প্রশিক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত শিক্ষিত হতে পারছে না। এ কারণে মনুষ্যত্বের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। এই সংকট উত্তরণে মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। নানান সঙ্গতি অসঙ্গতির মধ্যেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই শিক্ষক আছেন তিন লাখ ৪ হাজার তিনশত পচাঁনব্বই জন। তাছাড়া বেসরকারি এনজিও পরিচালিত, অনুমোদিত আর কিন্ডারগার্টেন মিলে আরো প্রায় ৩ লাখ ব্যক্তি শিক্ষকতায় জড়িত। ন্যাপ পরিচালিত প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন মাত্র ১৪ হাজার ৮১৩ জন শিক্ষক। প্রাথমিক শিক্ষায় কী ভয়াবহ পরিণতি শিক্ষক প্রশিক্ষণ থেকেই স্পষ্ট।
মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকই যদি প্রকৃত অর্থে শিক্ষক না হন, তাহলে কে গড়বে মানুষ? শিক্ষককে হতে হবে দীক্ষায় ও দর্শনে; কথায় ও কর্মে এক। বচনে ও আচরণে যে এক নয় সে শিক্ষক হওযার যোগ্য নয়। নীতি ও নৈতিকতার শিক্ষা শুধু পাঠদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। শিক্ষককে হতে হবে নৈতিকতার বাস্তব নমুনা। পারিবারিক পরিবেশে একটি শিশু নৈতিকতার প্রাথমিক অনুশীলন শুরু করবে- এটাই কাম্য, কিন্তু শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষকের সাহচর্যে ঘটবে এর পূর্ণ বিকাশ। এভাবেই প্রতিটি শিক্ষার্থী গড়ে উঠবে আদর্শ চরিত্রবান নাগরিক হিসেবে। এভাবে গড়ে উঠবে আদর্শ জাতি।
আমাদের দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও মেধার মান যথার্থভাবে সর্বাবস্থায় বিবেচিত হয় নি। যোগ্য প্রার্থীদের স্থলে নানা বিবেচনায় অযোগ্যদের প্রাধান্য দেয়া হয়। ফলে সঙ্গত কারণেই শিক্ষার মান নিুগামী। এ ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে হলে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা পরিবর্তন আনতে হবে। ৪ (চার) বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন অ্যাডুকেশন ডিগ্রি নীতি গ্রহণ করতে হবে। জেলা উপজেলায় সরকারি/বেসরকারিভাবে একাধিক ইনস্টিটিউট অব প্রাইমারি টিচার্স (ইপিটি) প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই দূরুহ কাজটি ময়মনসিংহে অবস্থিত জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমী দ্বারা সম্ভব নয়। যা ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণটি আদর্শিক প্রাতিষ্ঠানিক ডিপ্লোমা শিক্ষার সমতুল্য ও সমপর্যায়ে উন্নীত করতে হবে। কোর্স কারিকুলাম প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, পরিচালনে দরকার দেশের অন্যান্য ডিপ্লোমা শিক্ষা পরিচালনার ন্যায় সমন্বিত ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড।